August 5, 2026, 5:04 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
সপ্তাহখানেক আগেও বাজারে কাঁচা মরিচ কিনতে গিয়ে ক্রেতাদের চোখ কপালে উঠছিল। এক কেজি মরিচের জন্য গুনতে হচ্ছিল ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। অনেকেই আধা কেজি কিংবা ১০০ গ্রামের বেশি মরিচ কিনতে সাহস পাননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাঁচা মরিচ হয়ে উঠেছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। রান্নাঘরের সবচেয়ে সাধারণ উপকরণটি যেন এক বিলাসপণ্যে পরিণত হয়েছিল।
কিন্তু দৃশ্যপট বদলে যেতে সময় লাগেনি। ভারত থেকে মাত্র ১০ ট্রাকে ৯১ দশমিক ৫৫ টন কাঁচা মরিচ দেশে প্রবেশ করতেই বাজারের চিত্র পাল্টে যায়। একদিনের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে দাম কমতে শুরু করে, খুচরা বাজারেও কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত কমে আসে। প্রশ্ন উঠেছে—দেশে বছরে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন মরিচ উৎপাদিত হয়, সেখানে মাত্র ৯১ টন আমদানিতেই যদি বাজার এতটা নরম হয়ে যায়, তাহলে কয়েকদিন ধরে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যের পেছনে আসলে কী কাজ করছিল?
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে মরিচ উৎপাদন কমছে না; বরং বাড়ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে মরিচ উৎপাদন ছিল প্রায় ৪ লাখ ৯২ হাজার টন। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ৭ লাখ ৪৮ হাজার টনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫২ শতাংশ। গ্রীষ্মকালীন মরিচের উৎপাদনই বেড়েছে প্রায় ৮৫ শতাংশ।
তারপরও কেন প্রতিবছর বর্ষা এলেই মরিচের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়?
এবারের মৌসুমে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, পাবনা, বগুড়া ও রংপুর অঞ্চলের অনেক মরিচখেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাঠ থেকে বাজারে সরবরাহ কিছুটা কমে যায়। কিন্তু বাজার বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি থাকলেও সেটি কি এমন পর্যায়ে ছিল, যাতে খুচরা বাজারে দাম ৪০০ টাকায় পৌঁছে যায়?
সরকার পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারত থেকে ৫ হাজার ১৫০ টন কাঁচা মরিচ আমদানির অনুমতি দেয়। এরপর ১৬ জন আমদানিকারক এলসি খুলে আমদানি শুরু করেন। কিন্তু অনুমোদিত পরিমাণের সামান্য অংশ—মাত্র ৯১.৫৫ টন—দেশে পৌঁছানোর পরই বাজারের দাম দ্রুত কমতে শুরু করে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এখানেই লুকিয়ে আছে বাজারের আসল চিত্র। দেশের বার্ষিক উৎপাদনের তুলনায় ৯১ টন কার্যত অতি নগণ্য। এই পরিমাণ মরিচ পুরো দেশের এক দিনের চাহিদাও পূরণ করতে পারে না। তারপরও দাম কমে যাওয়ার অর্থ হলো, বাজারে প্রকৃত সংকটের পাশাপাশি মজুত, অতিরিক্ত মুনাফা এবং মনস্তাত্ত্বিক মূল্য নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকদিন আগেও যে মরিচ পাইকারি পর্যায়ে ২৫০ থেকে ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, আমদানি শুরু হওয়ার পর সেটি ১৫০ থেকে ১৮০ টাকায় নেমে আসে। খুচরা বাজারেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সামনে আরও কয়েক হাজার টন মরিচ আসবে—এই আশঙ্কাতেই অনেক পাইকার আগের দামে মরিচ ধরে রাখতে পারেননি।
তবে এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে কম সুবিধা পেয়েছেন কৃষক। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যখন রাজধানীতে কাঁচা মরিচ ৩০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছিল, তখন অনেক কৃষক ক্ষেতে পাচ্ছিলেন মাত্র ৮০ থেকে ১০০ টাকা। অর্থাৎ উৎপাদক ও ভোক্তার দামের ব্যবধান ছিল প্রায় তিনগুণ। এর মধ্যবর্তী লাভের বড় অংশ গেছে সংগ্রাহক, আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের হাতে।
এই চিত্র নতুন নয়। ২০২৩ সালেও কাঁচা মরিচের দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। ২০২৫ সালেও একই ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল। প্রতি বছর বর্ষাকালে একই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরে আমদানি বা নতুন সরবরাহ এলে দ্রুত দাম কমে যাওয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের বাজারে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সরবরাহ ব্যবস্থাপনা। কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তার টেবিলে পণ্য পৌঁছাতে একাধিক স্তর অতিক্রম করতে হয়। কোথাও উৎপাদনের তথ্যের সঠিক ব্যবহার নেই, কোথাও আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা নেই, আবার কোথাও বাজার তদারকি দুর্বল। ফলে সামান্য সরবরাহ ঘাটতিও অনেক সময় কৃত্রিম সংকটে রূপ নেয়।
ভারত থেকে মরিচ আমদানি তাই আপাতদৃষ্টিতে ভোক্তাদের স্বস্তি দিলেও এটি আরও বড় একটি বাস্তবতা সামনে এনেছে। দেশের বার্ষিক উৎপাদনের তুলনায় অতি সামান্য আমদানিতেই যদি বাজারে মূল্য অর্ধেকে নেমে আসে, তাহলে বোঝা যায়—সংকট শুধু উৎপাদনের নয়, বাজার পরিচালনারও।
কাঁচা মরিচের এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়ে গেল। কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, ভোক্তা অতিরিক্ত দাম দিচ্ছেন, অথচ মাঝখানে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে। কার্যকর বাজার তদারকি, স্বচ্ছ সরবরাহব্যবস্থা এবং কৃষক থেকে ভোক্তার দূরত্ব কমানো না গেলে আগামী বর্ষায় আবারও হয়তো একই প্রশ্ন উঠবে—কাঁচা মরিচের দাম কি প্রকৃত সংকটে বাড়ে, নাকি বাজারের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রকদের ইচ্ছায়?